কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬ এ ০৯:০৮ PM

ঐতিহ্যবাহী লোক ও কারুশিল্প

কন্টেন্ট: পাতা

লোকশিল্প (Folk Art) এবং কারুশিল্প (Craft/Handicraft) শব্দ দুটিকে আমরা প্রায়ই একসাথে "লোক ও কারুশিল্প" হিসেবে ব্যবহার করলেও, নন্দনতত্ত্ব, উপযোগিতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংজ্ঞার দিক থেকে এদের মধ্যে সূক্ষ্ম ও মৌলিক কিছু পার্থক্য রয়েছে। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, ড. দিনেশচন্দ্র সেন এবং ইউনেস্কো (UNESCO)-এর হেরিটেজ কনভেনশনের মতো নির্ভরযোগ্য ও অথেনটিক উৎসের আলোকে নিচে এই দুটি মাধ্যমের বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও পার্থক্য তুলে ধরা হলো।

লোকশিল্প (Folk Art)

সহজ কথায়, সাধারণ গ্রামীণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত চেতনা, বিশ্বাস, আচার-অনুষ্ঠান এবং ঐতিহ্য থেকে যে শিল্পের জন্ম হয়, তাকে লোকশিল্প বলে। এই শিল্পে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রয়োজন হয় না; বরং বংশানুক্রমিকভাবে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে এর রূপান্তর ঘটে।

  • মূল বৈশিষ্ট্য: লোকশিল্পের প্রধান লক্ষ্য ব্যবসায়িক লাভ বা উপযোগিতা নয়, বরং আত্মপ্রকাশ এবং সম্প্রদায়ের যৌথ অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ। এতে গ্রামীণ জীবনের সুখ-দুঃখ, ধর্মীয় বিশ্বাস ও প্রকৃতির ছোঁয়া থাকে। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের মতে, লোকশিল্প হলো মানুষের মনের ভেতরের সহজ ও অকৃত্রিম অনুভূতির প্রকাশ, যা মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষেরা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাকরণ ছাড়াই তৈরি করে।

    উদাহরণ:

    • নকশিকাঁথা: যা শুধু শীত নিবারণের জন্য নয়, বরং গ্রামীণ নারীর মনের সুখ-দুঃখের গল্প ও দৃশ্য ফুটিয়ে তোলে।
    • আলপনা ও পটচিত্র: ধর্মীয় ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে আঁকা চিত্র।
    • টেপাপুতুল: মাটির সহজ ও স্বতঃস্ফূর্ত গড়নে তৈরি পুতুল।
    • রিকশা পেইন্টিং: শহুরে লোকশিল্পের একটি আধুনিক ও অনন্য রূপ।


কারুশিল্প (Craft / Handicraft)

কারুশিল্প হলো মানুষের প্রযুক্তিগত দক্ষতা, শ্রম এবং নান্দনিক বোধের সমন্বয়ে তৈরি এমন শিল্পবস্তু, যা একই সাথে নান্দনিক এবং ব্যবহারিক বা উপযোগী। অর্থাৎ, এটি মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটায় এবং এর একটি সুনির্দিষ্ট বাণিজ্যিক মূল্য থাকে।

  • মূল বৈশিষ্ট্য: কারুশিল্পে কারিগরি দক্ষতার প্রয়োজন হয়। এটি তৈরির জন্য সুনির্দিষ্ট কাঁচামাল (যেমন: সুতা, বাঁশ, কাঠ, ধাতু) এবং বিশেষ সরঞ্জামের ব্যবহার জানা জরুরি। কারুশিল্পে বহুলাংশে বাণিজ্যিক উৎপাদন ও বিপণনের বিষয়টি জড়িত থাকে। ইউনেস্কো (UNESCO)-এর সংজ্ঞা অনুযায়ী, কারুশিল্প হলো সম্পূর্ণ হাত দিয়ে অথবা সাধারণ কোনো যন্ত্রের সাহায্যে তৈরি পণ্য, যেখানে কারিগরের শৈল্পিক অবদানই প্রধান এবং যা একই সাথে উপযোগী ও ঐতিহ্যবাহী।

    উদাহরণ:

    • জামদানি ও খাদি বয়ন: সুনির্দিষ্ট জ্যামিতিক নকশা এবং তাঁতের কারিগরি দক্ষতার চূড়ান্ত রূপ।
    • মৃৎশিল্প : দৈনন্দিন ব্যবহারের হাঁড়ি-পাতিল, সানকি বা কলস।
    • বাঁশ ও বেত শিল্প: কুলা, ডালা, মাদুর বা আসবাবপত্র।
    • দারুশিল্প: খাট, পালঙ্ক বা নৌকার গায়ে খোদাই করা নকশা।

সহজ ভাষায়, যখন একটি মাটির পাত্র কেবল ডাল-ভাত খাওয়ার জন্য নিখুঁতভাবে তৈরি করা হয়, তখন সেটি কারুশিল্প। কিন্তু সেই পাত্রের গায়ে যখন গ্রামীণ জীবনের কোনো উৎসব বা বিশ্বাসের ছবি/নকশা/মোটিফ মনের মাধুরী মিশিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়, তখন তা রূপ নেয় লোকশিল্পে। বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে এই দুটি ধারা একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে।

আয়তন ও বৈচিত্র্যের তুলনায় বাংলাদেশের লোক ও কারুশিল্পের ভান্ডার অনেক বেশি সমৃদ্ধ। কারুশিল্পের বিশাল ভান্ডারে রয়েছে জামদানি, শতরঞ্জি, ধাতব শিল্প, শঙ্খ শিল্প, মৃৎশিল্প, দারুশিল্প, ঝিনুক শিল্প, পুতুল শিল্প, পিতল-কাঁসা শিল্প, বাঁশ-বেত শিল্প, শোলা শিল্প ইত্যাদি। এছাড়াও নকশি কাঁথা, নকশি শিকা, শীতল পাটি, মাটির ফলকচিত্র, পাতা ও খড়ের জিনিস, লোকচিত্র প্রভৃতি আমাদের লোক ও কারুশিল্পের নিদর্শন। বেঁচে থাকার তাগিদে কাজ করতে গিয়ে এবং অবসর মুহূর্তে বসে এসব শিল্প-সম্পদ তৈরি করেছে কারুশিল্পীরা। বাংলাদেশের লোকজীবনের শৈল্পিক বৈশিষ্ট্যগুলোই বিধৃত হয়েছে আমাদের লোক ও কারুশিল্পে। এসব শিল্প আমাদের ঐতিহ্যের প্রতীক, সেই সাথে গৌরবেরও।


তাঁত ও বয়ন শিল্প : বাংলাদেশের তাঁত ও বয়ন শিল্পের ঐতিহ্য সর্বজনবিদিত। বিশেষ করে এ দেশের মসলিন ও জামদানির রয়েছে বিশ্বজোড়া খ্যাতি। কথিত আছে, এই মসলিন এবং জামদানি সারাবিশ্বে উঁচুমানের বস্ত্র হিসেবে বিবেচিত ছিল প্রায় অষ্টাদশ শতকের শেষ পর্যন্ত। হস্তচালিত তাঁত শিল্পেরই ফসল ঢাকাই মসলিন। আর সূক্ষ্ম জমিনের ওপর দুটি তোলা বিচিত্র সব নকশামন্ডিত মসলিনের নাম হচ্ছে- জামদানি। জামদানি মূলত মসলিনেরই অংশ। প্রাচীন আমলে উন্নতমানের জামদানি তৈরি হতো ঢাকা, ধামরাই, সোনারগাঁ, বাজিতপুর, জঙ্গলবাড়ী প্রভৃতি স্থানে। বর্তমানে ঢাকা, সোনারগাঁ, আড়াইহাজার, নরসিংদী, মনোহরদী প্রভৃতি স্থানে তৈরি হয়। আর ডেমরার হাট হচ্ছে জামদানির প্রধান বিক্রয় কেন্দ্র। জামদানি নকশা এখন শুধু শাড়িতেই সীমাবদ্ধ নেই। এমব্রয়ডারি পোশাক, শুভেচ্ছা কার্ড, বিয়ের আলপনা, চিঠির প্যাড এমনকি চামড়ার জিনিসপত্রেও বিস্তৃতি লাভ করেছে। প্রাচীনকাল থেকে এখন পর্যন্ত অক্ষুণ্ন রয়েছে জামদানির কদর। সময়ের প্রয়োজনে মসলিন, জামদানি কালের আবর্তে বিলীন হলেও আজও অক্ষুণ্ন রয়েছে ঢাকাই শাড়ির গৌরবময় জনপ্রিয়তা।


নকশি কাঁথা : নকশি কাঁথা বাংলাদেশের লোক ও কারু শিল্পের ঐতিহ্যমন্ডিত ও নান্দনিক নিদর্শন। পুরনো কাপড়ের কাঁথা সেলাই করে তার ওপর গ্রামবাংলার মহিলারা বিভিন্ন নকশা তোলেন-একেই বলে নকশি কাঁথা। এই নকশি কাঁথায় জড়িয়ে থাকে অনেক সুখ-দুঃখের স্মৃতি। ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, খুলনা, রাজশাহী, যশোর, ফরিদপুর, পাবনা, দিনাজপুর, বগুড়া প্রভৃতি জেলায় তৈরি হয় বিচিত্র ধরনের নকশা সংবলিত কাঁথা। এসব নকশি কাঁথার ব্যবহার ভেদে বিভিন্ন নামও রয়েছে। যেমন গায়ে দেয়ার কাঁথা, বিছানার কাঁথা, শিশুর কাঁথা, সুজনী কাঁথা, বর্তনী রুমাল কাঁথা, পালকর কাঁথা, বালিশের ঢাকনি, দস্তরখানা, পান পেঁচানী, আরশীলতা প্রভৃতি।


শিকাশিল্প : বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী লোক ও কারুশিল্প স্বতন্ত্র ও আপন মহিমায় সমুজ্জ্বল শিকাশিল্প। পাট হচ্ছে শিকা তৈরির প্রধান উপকরণ। তবে নকশি শিকা তৈরিতে কঞ্চি সুতলি, ঝিনুক, কড়ি, শঙ্খ, কাপড়, পোড়ামাটির বল ইত্যাদিও ব্যবহৃত হয়। বইপত্র, কাঁথা-বালিশ, শিশি-বোতল, বাসনপত্র, পাতিল-কলসি, আয়না-চিরুনি এসব সর্বত্রই বিভিন্ন সাইজের শিকা তৈরি করেন গ্রামীণ মাহলারা। হালে শিকার ব্যবহার কিছুটা কমলেও একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। গ্রামীন মহিলাদের তৈরি নকশি শিকার অসংখ্য আঞ্চলিক নাম রয়েছে, যেমন- উল্টাবেড়ী, ফুলটুংগী, রসুন দানা, আংটিবেড়, ফুলমালা, ডালিম বেড়, ফুলচাং, গানজা ইত্যাদি। বিদেশিদের কাছেও বাংলাদেশের শিকাশিল্প আবেদন তৈরিতে সক্ষম হয়েছে। পাট দিয়ে ঐতিহ্যবাহী শিকা তৈরির পাশাপাশি আজকাল পাটের তৈরি টেবিল ম্যাট, মানি ব্যাগ, ফ্লোর ব্যাগ, নেট, প্লেটম্যাট, লেডিস ব্যাগ, দেয়াল সজ্জা ও গৃহসজ্জারও রকমারি সামগ্রী তৈরি হচ্ছে। এসব সামগ্রীও দেশ-বিদেশে সমানভাবে সমাদৃত হচ্ছে।

নকশি পাখা : নকশিকাঁথা, নকশি শিকা আর নকশি পিঠার মতোই বাংলাদেশের লোক ও কারুশিল্পের ঐতিহ্যের আরেক প্রতীক হচ্ছে নকশি পাখা। তালপাতা, সুপারীর পাতা ও খোল, সুতা, পুরনো কাপড়, বাঁশের বেতি, নারিকেল পাতা, চুলের ফিতা, পাখির পালক ইত্যাদি অতি সাধারণ ও সহজলভ্য উপকরণ দিয়ে পাখা তৈরি করা হয়। আগে গ্রীষ্মকালে শরীর ঠান্ডা করার জন্য গ্রামবাংলায় হাতপাখার ব্যাপক প্রচলন ছিল। এখনও গ্রামবাংলায় নকশি পাখার ব্যবহার রয়েছে। তা নগর জীবনের অসহনীয় লোডশেডিংয়ের সময়ও ব্যবহার করা হয়। এসব নকশি পাখার রয়েছে বিভিন্ন নাম- যেমন বাঘাবন্দী, শঙ্খলতা, কাঞ্চনমালা, সজনে ফুল ইত্যাদি। এক সময় বর, বধূ ও তাদের সঙ্গে আসা মেহমানদের বড় সাইজের তালপাতার হাতপাখা দিয়ে বাতাস করা হতো।

শীতলপাটি : বাংলাদেশের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী এক শিল্পের নিদর্শন হচ্ছে শীতলপাটি। মুর্তা নামক এক ধরনের বেতি বা পাতি দিয়ে শীতলপাটি বোনা হয়। সিলেটের বালাগঞ্জ, রাজনগর, বরিশালের স্বরূপকাঠি, ফরিদপুরের সাতৈর, নোয়াখালীর সোনাগাজী, ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা প্রভৃতি স্থানে উন্নতমানের শীতলপাটি তৈরি হয়। আজকাল মানিব্যাগ, হাতব্যাগ, কাঁধে ঝোলানোর ব্যাগ, টেলিম্যাট প্রভৃতি কাজে ব্যবহৃত হয় শীতলপাটি।


লোকচিত্র : লোকচিত্র বাংলাদেশের লোক ও কারু শিল্পের এক বর্ণাঢ্য ও ঐতিহ্যবাহী ভুবন। নানা সৃষ্টিতে রূপ লাভ করেছে সৃজনশীল চিত্রশিল্প। আবহমানকালের লোক সমাজের দৈনন্দিন জীবন, ধর্ম বিশ্বাস, লৌকিক আচার-আচরণ ধারণ করে আসছে এ দেশের এক অমূল্য সম্পদ চিত্রিত হাঁড়ি। অঞ্চলভেদে এসব চিত্রিত হাঁড়ির রয়েছে বিভিন্ন নাম। বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্রই চিত্রিত হাঁড়ি, কলসি পাওয়া যায়। এরপরও ঢাকার ধামরাই, নয়ারহাট, টাঙ্গাইলের কালিহাতি, রাজশাহীর বসন্তপুর এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের বারোঘরিয়া প্রভৃতি এলাকার চিত্রিত হাঁড়ি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রাজশাহীর শখের হাঁড়িতে রয়েছে বাংলাদেশের আবহমানকালের ঐতিহ্য। এসব হাঁড়িতে ঘোড়া, পাখি, শাপলা ফুল, পানপাতা, মাছ প্রভৃতি মটিফ ব্যবহৃত হয়।


মৃৎশিল্প : বাংলাদেশের লোক ও কারুশিল্পে উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে মৃৎশিল্প। এ শিল্পের হাজার বছরের ইতিহাসও রয়েছে। এ শিল্পকে ঘিরে গ্রামবাংলার অনেক পরিবার জীবন-জীবিকাও নির্বাহ করে। ঢাকা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, কুমিল্লা, সিলেট, যশোর, দিনাজপুর, কক্সবাজার প্রভৃতি জেলার মৃৎ শিল্পীরা ঐতিহ্যগতভাবে মাটির জিনিসপত্র তৈরি করে আসছে। দেশের ঐতিহ্যবাহী মৃত শিল্পসামগ্রীর মধ্যে রয়েছে হাঁড়িপাতিল, কলসি, সানকি, চুলা, শাক-সবজি, ফলমূল, খেলনা, পুতুল, ঘরের টালি, পানি সেচের নালি, ধর্মীয় প্রতিকৃতি, প্রাণীজ প্রতিকৃতি, অলঙ্কার প্রভৃতি। গ্রামীণ হাটবাজার এবং শহর-বন্দরেও মাটির জিনিসপত্র পাওয়া যায়।

কৃতজ্ঞতা- আখতার হামিদ খান

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন